অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৯ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডলারের চাপ কিছুটা কমেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও এসেছে স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তির প্রভাব এখনো পড়েনি দেশের কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে।
বরং অর্থনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক উল্টো সংকেত দিচ্ছে। কমছে শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে, আর সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ও চলছে ধীরগতিতে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরছে না কেন?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদের হার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা নতুন উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগে এই স্থবিরতা দীর্ঘ হলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছুর ওপরই চাপ বাড়বে।
দেড় বছরের বেশি সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রায় আট মাস পার হলেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন এখনো বিনিয়োগে দেখা যাচ্ছে না।
নতুন বিনিয়োগের আগে উদ্যোক্তাদের এখন ভাবতে হচ্ছে, বিনিয়োগ করে আদৌ লাভ হবে কি না।
বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ অত্যন্ত প্রতিকূল।
“নতুন বিনিয়োগ কীভাবে হবে? কে বিনিয়োগ করবে? বিনিয়োগ করলে তার রিটার্ন আসবে, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? অনেকের পক্ষে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তার মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও একের পর এক সমস্যা সামনে আসছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, সুদের হার বেশি এবং সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও ফিরে আসেনি।
ফলে ব্যবসায়ীদের হতাশা বাড়ছে।
একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
তিনি বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ এখন চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা বাজারে টিকে থাকার লড়াই করছেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এ অবস্থায় ব্যবসা সম্প্রসারণের সাহস কে দেখাবেন—সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ হওয়ার তথ্য নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন হাতেম। তার প্রশ্ন, এই ঋণ কারা নিচ্ছেন এবং তারা ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কি না।
বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এর আগে মে মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জুনে তা কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে, যা তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ছিল।
অর্থাৎ সামান্য ওঠানামা থাকলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা উৎপাদন বাড়াতে সাধারণত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করেন। তাই ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকলে বিনিয়োগের গতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে ঋণ কম বাড়ার পেছনে শুধু ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহই দায়ী নয়। ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা এবং অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানা পুনরুজ্জীবিত করা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্যে গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেন।
বিভিন্ন খাতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত গতি এখনো আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি যাওয়ার আশা করেছিল। পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বরের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন মনে করেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণের চাহিদা খুব দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার মূল শর্ত হলো অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি হওয়া।
তার ভাষায়, উদ্যোক্তারা তখনই ঋণ নেবেন, যখন নিরাপদ পরিবেশে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে আয় করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস পাবেন। কারণ, ঋণ নেওয়ার পর থেকেই সুদ পরিশোধের চাপ শুরু হয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং ডলারের ওপর চাপ তীব্র হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
কিন্তু ডলারের চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার ব্যয় কমেনি। বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং জ্বালানির অনিশ্চয়তা এখনো উদ্যোক্তাদের চাপে রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমেছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের আরেকটি বড় জায়গা গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ। উৎপাদন খরচ বেশি থাকলে নতুন বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা আরও সতর্ক হয়ে পড়েন।
Posted ০২:৩০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন